সুরমা পারের কথা ডেস্কঃ
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিষেবা বাড়াচ্ছে জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সসহ দেশীয় বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে আকাশপথে যাত্রী পরিবহনে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের সংখ্যাও বাড়ছে। এয়ারলাইন্সগুলো সক্ষমতা অনুযায়ী যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রসার ঘটাতে উদ্যোগী হয়েছে। ১৫টি দেশের বিদ্যমান ২৩টি গন্তব্যের (রুট) পাশাপাশি আরো নতুন ১০ দেশসহ ১১টি রুটে ফ্লাইট পরিচালনার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এবং দেশীয় বেসরকারি এয়ারলাইন্স ইউএস বাংলা, নভোএয়ার ও এয়ারঅ্যাস্ট্রা।
এছাড়া ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৩৫টি বিদেশি এয়ারলাইন্স বিভিন্ন দেশের ৫২টি রুটে বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনা করছে। রুট বাড়ানোর পাশাপাশি ফ্লাইট ও এয়ারলাইন্সের সংখ্যা বাড়াতে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স নানা উদ্যোগ নিয়েছে।
বিমানবন্দরগুলোর আধুনিকায়ন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অত্যাধুনিক থার্ড টার্মিনাল নির্মাণসহ যাত্রীসেবার উন্নয়নে নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলছে। হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে বর্তমানে বছরে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুট মিলে প্রায় ৯০ লাখের মতো যাত্রী আসা-যাওয়া করে। থার্ড টার্মিনাল চালু হলে ফ্লাইট ও এয়ারলাইন্সের সংখ্যা বাড়বে। একই সঙ্গে বাড়বে যাত্রী সংখ্যাও। সেবার মান উন্নত হবে। কমবে টিকেটের দাম। সরকারের রাজস্ব আয়ও অনেক বাড়বে বলে মনে করছেন এভিয়েশন সংশ্লিষ্টরা।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মঞ্জুর কবীর ভূঁইয়া বলেন, থার্ড টার্মিনাল চালু হলে আমাদের সক্ষমতা আরো বেড়ে যাবে। নতুন আরো এয়ারলাইন্স আসবে, যারা আছে তাদের ফ্রিকোয়েন্সি বাড়াবে। এতে যাত্রী সংখ্যা আরো বেড়ে যাবে। সেবার মানও বাড়বে। ফ্লাইট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের রাজস্ব আয়ও বাড়বে।
বেবিচক ও বিমান সূত্র জানায়, বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে ২১টি উড়োজাহাজ রয়েছে। বিশ্বের ৭০টি দেশের সঙ্গে ফ্লাইট পরিচালনা চুক্তি থাকলেও বর্তমানে ১৫টি দেশের ২৩ রুটে বিমানের উড়োজাহাজ চলাচল করছে।
রুটগুলো হচ্ছে- যুক্তরাজ্যের লন্ডন, ম্যানচেস্টার; ইতালির রোম; সৌদি আরবের দামমাম, জেদ্দা, রিয়াদ ও মদিনা; কুয়েত, কাতার, ওমানের মাসকট, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবী, দুবাই, সারজাহ; ভারতের কোলকাতা, দিল্লি, চেন্নাই; নেপালের কাঠমান্ডু; জাপানের নারিতা; চীনের গুয়াংজু; মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও কানাডার টরেন্টো।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, শ্রীলঙ্কার কলম্বো, মালদ্বীপের মালে, অস্ট্রেলিয়ার সিডনি, ইন্দোনেশিয়ার বালি, ব্রুনেই, উজবেকিস্তান, চীনের কুনমিং, ফিলিপাইন, সুইজারল্যান্ড ও বেলজিয়ামে ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে বিমানের। এর মধ্যে ২০০৫ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া উজবেকিস্তানের সঙ্গে পুনরায় সরাসরি ফ্লাইট চলাচলের জন্য গত ৬ মে মন্ত্রিসভায় চুক্তির খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ১৯৯৩ সালে দেশটির সঙ্গে বিমান চলাচল শুরু হয়েছিল।
এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশ সুইজারল্যান্ড এবং বেলজিয়ামে নতুন রুট চালুর বিষয়ে সুইস ফেডারেল কাউন্সিল ও ইউরোপিয়ান কমিশনের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় গত জুনে। দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ফলে বিমানের ফ্লাইট সরাসরি চলাচলের পথ সুগম হলো। চুক্তির আওতায় দুই দেশের মনোনীত বিমান সংস্থাগুলো সপ্তাহে ৭টি যাত্রী ও ৭টি কার্গো ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারবে। এছাড়া দুই দেশের বিমানসংস্থাগুলো নিজেদের ও তৃতীয় কোনো দেশের বিমানসংস্থার সঙ্গে কোড শোয়ারের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারবে।
সুইজারল্যান্ডের পক্ষ থেকে সুইস এয়ার ইন্টারন্যাশনাল ও এডেলউইস এয়ার এজি এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস বাংলা এয়ার ও নভোএয়ারকে দুই দেশের মধ্যে পরিষেবা প্রদানের জন্য মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। তবে ২০০৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর দুই পক্ষের মধ্যে প্রথম চুক্তিটি অনুস্বাক্ষরিত হয়েছিল। এজন্য ২০৩৪ সালের মধ্যে আরো অন্তত ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত রয়েছে সরকারের। ইতোমধ্যে দুটি অত্যাধুনিক উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে এয়ারবাস না বোয়িং কেনা হবে তা এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি।
বিমানের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম বলেন, নতুন রুট চালুর প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে নতুন উড়োজাহাজ কেনার পরে গুরুত্ব অনুযায়ী রুট চূড়ান্ত করা হবে।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের বহরে বর্তমানে আছে ২৪টি উড়োজাহাজ। সম্প্রতি ৪৩৬ আসনের দুটি এয়ারবাস ৩৩০-৩০০ যুক্ত হয়েছে। ডিসেম্বরের মধ্যে আরো অন্তত ৩টি উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। বহরের নতুন এয়ারবাস দুটি আবুধাবিতে ফ্লাইট শুরু করেছে। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ সব রুট ছাড়াও বিদ্যমান দুবাই, শারজাহ, আবুধাবি, মাস্কাট, দোহা, কুয়ালালামপুর, মালে, সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, গুয়াংজু, চেন্নাই ও কলকাতা রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। এ এয়ারলাইন্সটি এখন প্রস্তুতি নিচ্ছে জেদ্দা, রোম ও লন্ডন রুটে ফ্লাইট পরিচালনার। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে রোম এবং অক্টোবর নাগাদ লন্ডন রুটে ফ্লাইট চালুর প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছেন ইউএস-বাংলার মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) মো. কামরুল ইসলাম।
এয়ারলাইন্স কোম্পানি নভোএয়ারের বহরে এটিআর ৭২-৫০০ মডেলের উড়োজাহাজ আছে ৭টি। ৯টি গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করা হচ্ছে। নিজেদের বহরে এ৩২১ মডেলের একাধিক উড়োজাহাজ যুক্ত করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে সংস্থাটির। উড়োজাহাজগুলো যুক্ত হলে পর্যায়ক্রমে ব্যাংকক, কুয়ালালামপুর, দুবাইসহ ৬টি আঞ্চলিক গন্তব্যে ফ্লাইট চালু করতে চায় এয়ারলাইন্সটি। দেশের নবীনতম উড়োজাহাজ পরিবহন সংস্থা এয়ার অ্যাস্ট্রার (অ্যাস্ট্রা এয়ারওয়েজ) উড়োজাহাজ আন্তর্জাতিক রুটে ডানা মেলতে চায় এ বছরেই। আগামী অক্টোবর নাগাদ ভারতের কলকাতা এবং নেপালের কাঠমান্ডু ও পোখারায় ফ্লাইট চালু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দ চেয়ে গত মার্চে বেবিচকে আবেদন করেছে সংস্থাটি। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ রুটে পরিচালনা করা এ কোম্পানির বহরে ৩টি উড়োজাহাজ রয়েছে।
এদিকে শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি এয়ারলাইন্স ছাড়া যাত্রী আনা-নেয়া করছে যেসব এয়ারলাইন্স তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে-এয়ার অ্যারাবিয়া, এয়ার এশিয়া, এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস, চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইনস, চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্স, ড্রাগন এয়ার, ড্রæক এয়ার, পারো এমিরেটস, ইত্তিহাদ এয়ারওয়েজ, গালফ এয়ার, জেট এয়ারওয়েজ, কুয়েত এয়ারওয়েজ, কিংফিশার এয়ারলাইন্স, মালেশিয়ান এয়ারলাইন্স, মালদিভিয়ান এয়ারওয়েজ, কাতার এয়ারওয়েজ, রাখ এয়ারওয়েজ, সৌদি আরাবিয়ান এয়ারলাইন্স, সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স, থাই এয়ারওয়েজ ইন্টারন্যাশনাল, টার্কিশ এয়ারলাইন্স ও ইয়েমেনিয়া। এর সঙ্গে নভেম্বরে যুক্ত হয়েছে ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্স।
এটির উড়োজাহাজ ঢাকা-আদ্দিস আবাবা রুটে চলাচল করবে। এছাড়া রুটটিতে কার্গো উড়োজাহাজ চালু করারও প্রস্তুতি চলছে।
এভিয়েশন বিশ্লেষক নজরুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট যত বাড়বে, ততই আমাদের জন্য ভালো। এতে করে যাত্রী সেবার মান বাড়বে, কমবে টিকিটের দামও। অনেক সময় যাত্রীদের চাপে বিভিন্ন রুটে সিন্ডিকেট করে টিকেটের দাম বাড়ানো হয়। এয়ারলাইন্সের সংখ্যা বেড়ে গেলে তখন আর এটি থাকবে না।
ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম জানান, যেসব দেশে প্রবাসী বাংলাদেশি বেশি সেসব দেশেই ফ্লাইট পরিচালনা করার পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে ইউএস বাংলা। যাত্রীসেবার মান আরো উন্নত করার ওপরও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে